অজানা গোপগড়

15589977_1303988709623399_4229814426147434643_nএক এক করে বাতিল হয়ে গেল ঝাড়গ্রাম, শান্তিনিকেতন, সুন্দরবন আর হেনরী আইল্যান্ড। বেথুয়াডহরীতে  যে  ফরেস্ট বাংলো আছে অবস্থান গুণে তা লোভনীয় হলেও ওখানে দু-রাত কাটানোর মতন সাহস হল না, আমার তাই শেষ পর্যন্ত গোপগড় যাওয়া ঠিক করলাম।15621950_1304006249621645_2324780063489600438_nএকটু অচেনা নাম কিন্তু কলকাতায় আমার বাড়ি থেকে দূরত্ব মাত্র ১৪৭ কিলোমিটার বড়জোর সাড়ে তিন ঘণ্টা।  সকালের চা টা খেয়ে  সাতটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা, sandwich pack করে নিয়েছি আর ফ্লাস্ক ভরে coffe।  সাঁতরাগাছি পেড়িয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ক্রসিং থেকে বাঁদিক নিয়ে NH-16 ধরলাম আমরা।15590633_1304006302954973_358140484552996281_n.jpgরাস্তা খারাপ না আর আমরাও চলেছি ছুটির মেজাজে কাজেই খিদে-তেষ্টা যখন মালুম হল তখন  কোলাঘাট  পেড়িয়ে গেছি আমরা। শীতের কামড় মোটেই নেই, রাস্তার ধারে গাছের ছাওয়াতে দাঁড়িয়ে  চট্‌পট্‌ খাওয়া শেষ করে আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম পশ্চিম-মেদিনীপুর অভিমুখে।120.jpgধরমা থেকে বাঁ-দিকের রাস্তা দিয়ে  এগিয়ে লাইব্রেরী রোড ধরে এসে পড়লাম বটতলা চক, এবার ডানদিকের হসপিটাল রোড দিয়ে মেদিনীপুর stationকে ডানদিকে ফেলে এগিয়ে গেলাম ধেরুয়া-মেদিনীপুর রোড ধরে। station থেকে মোটে পাঁচ কিলোমিটার এগোলে ডানদিকেই চোখে পড়বে গোপগড় হেরিটেজ পার্ক অ্যান্ড ইকো ট্যুরিজম সেন্টারের সাইনবোর্ড। পাকা রাস্তা ছেড়ে এবার ধরলাম কাঁচা রাস্তা, গ্রামের ভিতর দিয়ে এসে পৌঁছলাম গোপগড়ে ঢোকার গেটে, হাতঘড়িতে সবে সাড়ে দশটা।15542285_1303781572977446_6583776250866635366_nমুকুটমনিপুরের সোনাঝুরি বা গড়পঞ্চকোটের প্রকৃতি ভ্রমন কেন্দ্রের মতন গোপগড়ও ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর property কিন্তু ওগুলোর থেকে আয়তনে কয়েকগুণ বড়। সামনের লোহার দরজা বন্ধ কিন্তু পাশের ছোট্ট টিকিট ঘরে দারোয়ান দাদার দেখা পেলাম। ওনাকে বুকিং-এর কাগজ দেখাতে উনি চট্‌ করে ফোন লাগালেন কেয়ারটেকার বাবুকে।15626363_1305638856125051_2100524892372295080_oফোনে কেয়ারটেকার বাবু আমাদের বুকিং ডিটেলস্‌ জেনে নিলেন। ওনার কথা মত বুকিং-এর কাগজ দারোয়ান দাদাকে জমা দিয়ে আমরা আবার গাড়িতে চেপে বসলাম। গেট থেকে দু কিলোমিটার ভিতরে ওয়াচ্‌ টাওয়ারের সামনে এসে নামলাম আমরা। প্রায় চল্লিশ ফুট উঁচু এই ওয়াচ্‌ টাওয়ার থেকে চারিদিকে বহুদূর অবধি দেখা যায়  যার বেশিটাই সবুজে মোড়া।15591195_1305637569458513_3291243025949617176_oএই ওয়াচ্‌ টাওয়ারের পাশে ছোট একটা ক্যান্টিন আর সামনে দুটো সুন্দর কটেজ, পথিক আর প্রিয়া। ওয়াচ্‌ টাওয়ার থেকে নেমে পাশের আম বাগানে ঢুকে দেখি গাছের ছায়াতে বেশ কয়েকটা বসার যায়গা বানানো আছে। দু-দন্ড বসতে না বসতেই কেয়ারটেকার(হিরালাল ৯৭৩২৭৮৪৩৯৯) বাবু হাজির।15676480_1305638719458398_6017325509102252809_oপ্রিয়াতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে উনি আবার গায়েব হয়ে গেলেন। মাত্র পাঁচশ টাকায়ে দুটো ঘর, দুটো বারান্দা,একটা বন্ধ কিচেন আর গিজার লাগান বাথরুম নিয়ে বেশ হাত-পা ছড়িয়ে থাকার মত ব্যবস্থা যদিও সর্বত্র অবহেলার ছাপ।15542068_1303781602977443_3850271936819927580_nএকটু ফ্রেশ হয়ে সবার আগে আমরা ক্যান্টিনে গিয়ে ভাব জমালাম রাম বাবুর (৯৭৩৩০৬০৬২৫) সাথে, দুপুরের খাওয়ার বন্দোবস্ত করে এবার বেরলাম চারিদিক ঘুরে দেখতে। কেয়ারি করা অপূর্ব বাগানে ফুলের ছবি তুলে আর সবুজে ঘেরা চিলড্রেন্‌ পার্ক ঘুরতে ঘুরতেই দেখি দুটো বেজে গেছে অগত্যা ফিরে আসতে হল ক্যান্টিনে।15589720_1303978946291042_7120096979735786374_nদুপুরে খাওয়ার খেয়ে আমরা একটু রেস্ট নিলাম তারপর বেড়িয়ে পড়লাম গোপ রাজাদের গড়-এর ভগ্নাবশেষ দেখতে। এই গড় গড়পঞ্চকোটের গড়ের থেকে একটু ভাল অবস্থায় আছে কাজেই ভিতরে ঢোকা বারন থাকলেও একটা আবছা পায়ে চলার রাস্তা অনুসরন করে আমি ঢুকে পড়লাম ছবি তোলার লোভে।15584987_1305638636125073_1272173008866340357_oবাইরে থেকে দেখতে এই গড় যতটা আকর্ষনীয় আগাছায় ঢাকা আধ অন্ধকার ভিতরটা তার থেকে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।15591557_1305638186125118_4527636141727498414_oশীতের বিকেলের সূর্য একটু একটু করে হেলে পড়ছে জঙ্গলের আড়ালে, ঠাণ্ডাটাও পড়ছে আস্তে আস্তে, পাখিরা  কলরব করতে করতে উড়ে যাচ্ছে তাদের বাসার দিকে আর আমরাও গুটি গুটি পা বাড়ালাম আমাদের কটেজের  দিকে।15589831_1304006139621656_7662602368790074109_nদিনেরবেলা পিকনিক করতে আসা বা পার্কে ঘুরতে আসা লোকজনের দেখা পাওয়া গেলেও বিকেল পাঁচটার পর সব একেবারে শুনশান। গায়ে গরম জামা চাপিয়ে গরম গরম চা খেতে খেতে তারা ভরা আকাশ দেখব বলে  আমরা এসে বসলাম রাম বাবুর ক্যান্টিনের সামনের খোলা জায়গাটায়।15590277_1303781536310783_4354677464032945811_nএতক্ষণে অন্ধকারটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, এক হাত দূরেও দৃষ্টি চলে না, এমন সময় কে যেন এসে কাছেই  একটা আলো জ্বালিয়ে দিল।  সুউচ্চ স্থম্ভের উপর চারটে ভেপার ল্যাম্প আমাদের আশেপাশের অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়াতে আমরা একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে উঠে পড়লাম।প্রকৃতির কোলে থাকব বলে ঘুরতে এসে ঘরবন্দী হয়ে টিভি দেখার কোন মানেই হয় না, সুতরাং পিছনের বারান্দাটা খুলে চেয়ার পেতে বসে পড়লাম আড্ডা মারতে।15578912_1303781419644128_5600627500058278177_nএই দিকটা এখনও বেশ অন্ধকার কারন ভেপার ল্যাম্পের আলো গাছের ঘন পাতার জাল কেটে ঢুকতে পারছে না তবে মাথার উপর থাকা ছাদ আর ঝুঁকে পড়া গাছের ডালের জন্য তারারা এখন অদৃশ্য।15665456_1304006216288315_4327845004837029403_nঅন্ধকারের সাথে নিঃস্তব্ধতা মিলেমিশে একাকার, গাছের পাতায় ঠান্ডা বাতাসের আওয়াজ, রাতচরা পাখির ডাক, শুকনো ঝরে পরা পাতায় সড়সড় আওয়াজ, বিরতিতে দূরে কংশাবতীর উপর ধাতব সেতুতে মালগাড়ি যাওয়ার তীক্ষ অথচ গমগমে আওয়াজ, আর আমরা নীচু আওয়াজে কথা চালাচ্ছি, আড্ডাটা ভালই জমেছিল কিন্তু তাতে ছেদ পড়লো যখন দরজায় জোরে জোরে কেউ ধাক্কা দিল।15622495_1304006006288336_1967622216619892053_nচমকে উঠলাম আমরা, আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে দরজা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম, পরে অনুধাবন করলাম  যে  ভীষণ রকম নিঃস্তব্ধতাই এই সামান্য কড়া নাড়াকে জোরে আওয়াজে পরিণত করেছে। তড়িঘড়ি উত্তর দিলাম। রামবাবু এসেছেন, অনুরোধ করলেন তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়ার নিয়ে নিতে, ওনারা দুজন বাড়ি চলে যাবেন, বললেন এর পর এত বড় premisesএ আমরা চারজন ছাড়া শুধু তিনজন দারওয়ান থাকবেন, আমরা থাকব ভীশনভাবে একা। শুনেই রোমকূপ খাড়া হয়ে গেল, যদিও সেটা  ভয় নয় শুধু মাত্র একাকী থাকার রোমাঞ্চ…15590635_1303988629623407_374511671010939196_nআর্লি ডিনার সেরে আশ্রয় নিলাম কম্বলের নীচে, তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরার তাল করছি কারন সকালে সান রাইজ দেখার ইচ্ছা আছে। ট্রেনের আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পরেছিলাম জানি না কিন্তু ঘুম বেশ ভালই হয়েছিল।15626086_1305639159458354_6247263749360629673_oঅ্যালার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙল ভোর ভোর। গরম জামা গায়ে চাপিয়ে, কান-মাথা ঢেকে বাইরে এসে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওয়াচ্‌ টাওয়ারে উঠে দেখালাম এখনও আলো ফোটেনি এই চরাচরে। হাওয়া দিচ্ছিল ভাল তাই ঠাণ্ডাটাও লাগছিল বেশি, তাকিয়ে আছি পূব দিকে, হটাত করে বেশ একটা টাইগার হিল-টাইগার হিল ফিলিং হল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আস্তে আস্তে আলো ফুটতে শুরু করল কিন্তু ঘন কুয়াশার জন্য শেষ অবধি সূর্য দেবের দেখা পাওয়া গেল না আর। কাজেই ফিরে চললাম রুমের দিকে, যদি আরেকবার ঘুম মারা যায়।15578656_1304006389621631_3654956687149240583_nমর্নিং শো’স দ্য ডে, কথাটা সব সময় খাপ খায় না কারন সকাল নটা নাগাদ দেখি যে রোদ উঠেছে কড়কড়ে। সময় নষ্ট না করে চেয়ার পেতে বসে পরলাম বারান্দায়ে, রোদ পোহাতে। সারা সকালটা অলস ভাবে কাটিয়ে দিলাম আমরা, ঠিক করলাম দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া করে বাকি propertyটা  explore করতে বেরোবো।

IMG_2697.jpgকথা মত লাঞ্চ সেরে বেড়িয়ে পরলাম আমরা, চারিদিকে অজস্র পিকনিক spot, জংগুলে রাস্তা ধরে আমরা এসে পরলাম এক জলাশয়এর ধারে। শুনলাম এখানে বোটিং করা যায় যদিও কোনো বোট চোখে পড়ল না, বরং দেখা পেলাম একটা পানকৌড়ীর, সে চাতকের মতন জলের দিকে তাকিয়ে বসেছিল।15591215_1305635732792030_7219557762475529110_o15578296_1305635932792010_4559109500059046922_oএর অপর প্রান্তে ত্রিকোনামিতি সম্পর্কিত একটা পিরামিড আছে এই premisesএ, যদিও তিনের বদলে এর চারটে সাইড। এই পিরামিড যে কি কাজে লাগে তা বোধগম্য হল না কিন্তু এটা দেখতে এসে কিছু পাখির ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে গেলাম।

ছবি তুলতে তুলতে বুঝলাম দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। কটেজএ ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল, দিনটাও শেষ হয়ে আসছে, কাল দুপুরবেলা লাঞ্চ করে বেড়িয়ে পড়তে হবে কলকাতার জন্য তবু কেন যেন মনটা এবার ভারি হয়ে নেই…

Advertisements

One thought on “অজানা গোপগড়

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s