Jagannath temple, Puri – 2

jকথিত আছে যে দ্বাপর যুগে মাতা যশোদা,দেবকী এবং সুভদ্রা একবার বৃন্দাবন থেকে দ্বারকা এসেছিলেন। সেইসময় দ্বারকাতে উপস্থিত রানীরা তাঁদের অনুরোধ করেন বালক শ্রীকৃষ্ণর লীলা শোনাতে। লীলার গল্প চলা কালিন সুভদ্রা দ্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন যাতে শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরামের আগামন বার্তা আগাম জানিয়ে দিতে পারেন সকলকে। কিন্তু সেই গল্প শুনতে শুনতে সুভদ্রাও এত মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে দুই ভাইয়ের আগমন তিনি টেরই পান নি।                                                                jaganath-tumblr_m178tec2jj1qdpe2qo1_500                                       শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম নিজেদের বাল্য লীলা শুনে এতটাই আনান্দ পেয়েছিলেন যে তাঁদের চুল খাড়া হয়ে যায়, চোখ গোলগোল হয়ে যায়, হাঁসিটা আরও বেড়ে যায় এবং ওনাদের শরীর ভক্তি আর প্রেম ভাবনাতে গলে যেতে থাকে। সুভদ্রা সব শুরু থেকে শোনায় উনিই সবথেকে বেশি বিগলিত হয়ে পরেন, তাই আজও ওনার মূর্তি দৈর্ঘে এবং প্রস্থে বাকি দুজনার তুলনায় কম। যাইহোক, সেই সময় সর্ব ঘটে কাঁঠালি কলার মতন আবির্ভাব হয় নারদ মুনির। নারদ মুনি শ্রীকৃষ্ণের এই রূপ দেখে অভিভূত হয়ে বলেন, হে প্রভু আপনি কবে এই রূপে অবতার নেবেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে কলিযুগে ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব তটবর্তি  উপকূলে তিনি আবার জন্ম নেবেন এই রূপে।

রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এক সন্ন্যাসীর বার্তা পেয়ে বিদ্যাধরকে শ্রী বিষ্ণুর সন্ধানে বর্তমান উড়িষ্যাতে পাঠান। বিদ্যাধর ওখানে এক গুহায় নীলমাধবের রূপে বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দেখা পান এবং রাজাকে খবর পাঠান। সেই খবর পেয়ে উৎফুল্ল চিত্তে রাজা তড়িঘড়ি ভগবানের দর্শনে বেড়িয়ে পরেন কিন্তু এসে দেখেন শূন্য গুহা, ভগবান অদৃশ্য হয়েছেন। বিষণ্ণ রাজা ভেবে পান না কি করবেন এমন সময় তিনি এক দৈববানী পান, সেইমতন তিনি পুরীর তটভূমিতে যান এবং সমুদ্রে একটি গাছের গুঁড়ি ভাসতে দেখেন। দৈববাণী অনুযায়ী রাজা ওই গাছের গুঁড়িটি জল থেকে তুলে আনেন এবং তা দিয়ে শ্রীকৃষ্ণর মূর্তি বানানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু আবার তিনি বাধার সম্মুখীন হন, যেহেতু কেউ শ্রীকৃষ্ণকে চাক্ষুষ করেনি তাই তার রূপ অজানা এবং ওই গাছের গুঁড়িটি এত শক্ত যে  তাতে দাগও কাটতে বিফল হয় সবাই। এবার আবির্ভাব হয় বিশ্বকর্মা দেবের, তিনি ছদ্মবেশে রাজার সামনে উপস্থিত হন এবং বলেন যে তিনি এই দুরূহ কাজটি করতে সক্ষম যদিও তা শর্তসাপেক্ষ।

indradyumna-and-jagannathaশর্ত হল এই মূর্তি তিনি ২১ দিন ধরে রুদ্ধদ্বারে গড়বেন এবং কেউ ইতিমধ্যে তাঁকে বিরক্ত করবে না। রাজা দুবার না ভেবেই রাজি হয়ে যান এবং রুদ্ধদ্বারে মূর্তি তৈরি আরম্ভ হয়। পনেরো দিনের মাথায় রানী আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে কৌতুহল বশত দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। বন্ধ দরজার ভিতরে দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণের অসম্পূর্ণ মূর্তি এবং বিশ্বকর্মা অদৃশ্য। পরে এই মূর্তিই স্থাপিত হয় পুরী মন্দিরে।

maxresdefault.jpg

মনে করা হয় প্রাচীন কালে এখানেই একটি বৌদ্ধ স্তূপ ছিল যেখানে গৌতম বুদ্ধের একটি দাঁত সংরক্ষিত ছিল  এবং ওই দাঁত নিয়ে প্রতি বছর এক শোভাযাত্রা হত যা আজকের রথযাত্রার অনুরূপ। হিন্দু ব্রাহ্মণদের চাপে  একসময় এখান থেকে বৌদ্ধ  ধর্মাবলম্বীরা সেই দাঁত নিয়ে শ্রীলঙ্কা চলে যান এবং স্তূপ প্রতিষ্ঠা করে গৌতম বুদ্ধের ওই দাঁতটি সংরক্ষণ করেন যা আজও বর্তমান সেখানে।

Juggernauttemplet.jpg

সম্প্রতি একটি তাম্রলিপি আবিষ্কার হয়েছে যা থেকে জানা যায় গঙ্গা বংশের রাজা, রাজা অনন্ত বর্মণ চৌর গঙ্গ দেব তার রাজত্বকালে (১০৭৮ – ১১৪৮) এই মন্দিরের জগমোহন এবং বিমান অংশটি তৈরি করেন। যদিও  ওড়িশার  রাজা অনঙ্গ ভীম দেব ১১৭৪ সালে এই মন্দির পুনরুদ্ধার করে আজকের রূপে পূর্ণতা প্রদান করেন। তখন থেকে ১৫৫৮ সাল পর্যন্ত এখানে জগন্নাথ দেবের রূপে (বড় ঠাকুর) শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা হতে থাকে  একটানা। এরপর হয় কালাপাহাড়ের হামলা, কোণারকের সূর্য মন্দির সহ সারা উড়িষ্যা জুড়ে ধ্বংস হতে  থাকে  একের পর এক মন্দির। ভাগ্যক্রমে পুরী মন্দির রক্ষা পায় যদিও বন্ধ হয়ে যায় আরাধনা। পরে  উড়িষ্যার  রাজা,  রামচন্দ্র দেব এই মন্দির পুনঃ-প্রতিষ্ঠাপিত করেন এবং সম্ভবত ১৬০৭ সালের আশেপাশে  আবার শুরু হয়  আরাধনা।

jagannatha-temple1_slideshow

উৎকল স্থাপত্যর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এই পুরী মন্দির ২১৮ ফিট উঁচু এবং ২০ ফিট উঁচু অভেদ্য পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা যার নাম মেঘনাদ। মূল মন্দিরের চূড়াতে অষ্টধাতুর একটি চক্র আছে যার নাম নীল চক্র, এটি জগন্নাথ দেবের প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং বজ্র বিদ্যুৎ থেকে মন্দিরকে বাঁচাতে ইন্সুলেটার হিশাবেও কাজ করে।  এই চক্রের উপর  তিনকোনা ধ্বজা / পতাকা উড়তে দেখা যায় যার নাম পতিত পাবন।

neelachakra.jpg

প্রতিদিন বিকালে এই পতাকা বদল হয় এবং ঠিক চোদ্দ বছর বয়সী এক বালককে এক বছরের জন্য প্রতিদিন এই কাজ করতে হয়। চোদ্দ বছর বয়সী এক বালকের তরতর করে বেয়ে ২০০ ফিটের বেশি ওঠা, পতাকা বদল এবং নেমে আসা প্রত্যক্ষ করা, সে সত্যিই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

sun-temple-konark.jpg

মূল মন্দির ছাড়াও এই চত্বরে আরও ৩০টি মন্দির আছে এবং ১২০ দেবদেবীর মূর্তি আছে। তৎকালীন স্থাপত্তশৈলী অনুসারে সব মন্দিরই একটি মণ্ডপ এবং প্রধান গর্ভগৃহ নিয়ে তৈরি হলেও এই মন্দির আরও বিস্তৃত ভাবে তৈরি। পুরী মন্দিরের চারটি অংশ, প্রথমে সবথেকে বাইরের দিকে ভোগমণ্ডপ, তারপর নাট্যমন্দির, তারপর জগমোহন এবং সর্বশেষে গর্ভগৃহ বা দেউল বা বিমান যেখানে জগন্নাথ দেব অবস্থান করেন দাদা বলরাম এবং ভোগিনী সুভদ্রার সাথে। দেব পরিক্রমা করতে গিয়ে বুঝেছি, এই গর্ভগৃহ আদতে বেশ অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এবং পিছলা তবে সূর্যালোক যে এই গর্ভগৃহে প্রবেশ করে না তা নয়। বহু বছর আগের এক অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পূর্বমুখী এই গর্ভগৃহে ভোরের এক নির্দিষ্ট সময় সূর্যালোক প্রবেশ করে এবং জগন্নাথ দেব সেই আলোতে স্নাত হয়ে তাঁর দিন শুরু করেন, সূর্য স্নানের পর তাঁকে ফুল চন্দনের জলে চান করানো হয় এবং আরও কিছু আচার অনুষ্ঠানের পর তাঁকে নুতন কাপড় পড়ানো হয় প্রতিদিন, আমি জানিনা আর কতজনের এই অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য হয়ছে, সালটা ছিল ১৯৮৪ আমি তখন বেশ ছোট। ২০০০০০ sq/ft যায়গা জুড়ে থাকা এই মন্দিরের চারটি প্রবেশদ্বার আছে, দক্ষিণে অশ্বদ্বার, পশ্চিমে ব্যাঘ্রদ্বার, উত্তর দিকে হস্তিদ্বার এবং পূর্ব দিকে প্রধান সিংহদ্বার।

jagannath_temple_puri_10_-_arunpillar4

সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে অরুণ স্থম্ভ, অরুণ মানে সূর্যের রশ্মি। এটি আসলে পুরী মন্দিরের অংশ নয়, এই অরুণ স্থম্ভ আদতে কোনারক সূর্য মন্দিরের নাট্য মণ্ডপ ও জগমোহনের মাঝে স্থাপিত ছিল। মারাঠা রাজত্বকালে (১৭৫১ – ১৭৯৩) এক ব্রাহ্মণ এই স্থম্ভ কোনারকের বালি চাপা ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে পুরী মন্দিরে স্থাপন করেন। গ্রানাইট পাথরের তৈরি ৩২ ফুট উঁচু অপূর্ব অটুট এই স্থম্ভ এবং তার উপর করা কারুকার্য নিজেই এক বিস্বয়।

imagess09svrh0

সিংহ দুয়ারের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল দুই রক্ষীর নাম জয় এবং বিজয়, বলা হয় সেই যুগে এরমি  ছিল মানুষের উচ্চতা। কথাটা যদিও কিছুটা অবিশ্বাস্য তবে আমাদের পূর্বপুরুষরা যে আমাদের থেকে লম্বা ছিলেন তার একটা প্রমান এই মন্দিরেই পাওয়া যায়। গৌড়ীয় বৈষ্ণব শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু জগন্নাথ দর্শনে গেলে তাঁকে তৎকালীন পাণ্ডারা গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি দেয় নি। তখন তিনি গর্ভগৃহের উল্টো দিকে দূরে দাঁড়িয়ে একটি পাথরের দেওয়ালে হাত রেখে হেলান দিয়ে দেবদর্শন সারেন। সেই পাথরে তাঁর হাতের ছাপ আজও বর্তমান এবং সেটা প্রায় সাত ফিট উঁচুতে। কাজেই বলা যেতে পারে আমাদের পূর্বপুরুষ কিছুটা হলেও আমাদের থেকে লম্বা ছিলেন। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উড়িষ্যার তৎকালীন রাজা প্রতাপরুদ্র  বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহনের সিধান্ত নিলে পাণ্ডারা বুঝতে পারেন যে তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি খতম হতে চলেছে । রাজা দীক্ষা নেওয়ার আগের রাতে পাণ্ডারা শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে গুম-খুন করে এবং রটিয়ে দেয় যে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু স্বর্গদ্বার দিয়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছেন, অন্য মতে মহাপ্রভুতে (জগন্নাথে) বিলীন হয়ে গেছে। আসলে তারা হয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে হত্যা করে সমুদ্রে  ভাসিয়ে দেয় অথবা দুই লক্ষ sq/ft মন্দির চত্বরেই কোথাও লুকিয়ে ফেলে। শুধু তাই নয়, বর্তমান কালে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর মৃত্যু নিয়ে গবেষণারত তিন ব্যক্তিরও মৃত্যু ঘটে যথেষ্ট রহস্যজনক ভাবে।

images9tvp7ihq

পুরী মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ নিষেধ, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তারা (পাণ্ডারা) মন্দিরে প্রবেশ করতে দেন নি কারন তাঁর স্বামী মুসলিম ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীকে তারা মন্দির চত্বরে ঢুকতে দেয় নি কারন তিনি হরিজনদের নিয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন এবং বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথকেও তারা মন্দিরে প্রবেশ করতে দেই নি কারন তিনি ব্রাম্ভ সমাজের অংশ ছিলেন।

sri-jagannatha-temple1.jpg

Archaeological Survey of India পুরী মন্দিরের সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে অনেকদিন আগেই, অনুমান করা হচ্ছে ২০১৭ সালেই এই মেরামতি প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে যদিও বালিতে বসে যাওয়া মন্দিরের নীচের খানিকটা অংশ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s