বসন্ত উৎসব – ঝাড়গ্রাম ১

কোনো প্রতিকূলতাই আমাকে আটকে রাখতে পারেনি গত দুবছর। রক্তে আছে বেড়াবার নেশা আর এই নেশা ছাড়বার পাত্র আমি অন্তত নই। এই বছর দোলের ছুটি সাকুল্লে প্রায় তিন দিন অথচ আমার ঘুরতে যাওয়া এবার অনিশ্চিত। বেশ মনমরা ছিলাম কিন্তু আনন্দে নেচে উঠলাম যখন জানতে পারলাম ঝাড়গ্রামে আমি শেষ মুহূর্তে আমন্ত্রিত।

IMG_3622IMG_3646

IMG_3638.jpgশারবা বলল একবার একা ঘুরে আসতে, ওকে ছাড়াই, আর আমিও লুফে নিলাম প্রস্তাবটা। শনিবার দক্ষিণাপনের সিঁড়িতে বসে উদয়নদার সাথে সেরে নিলাম মিটিং। এবারের যাত্রাটা বেশ আলাদা, আমাকে মাথা ঘামাতে হয়নি ট্রেনএর টিকিট কাটতে বা গাড়ি এবং হোটেল বুক করতে।

IMG_3623IMG_3628IMG_3664

সকাল সকাল উঠে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম, সবার আগে তুললাম বসুন্ধারাদিকে তারপর উদয়নদাকে  তুলে সোজা হাওড়া। গাড়িতে যেতে যেতে আলাপ হয়ে গেল বসুন্ধারাদির সাথে আর তারপর হাওড়াতে গিয়ে পরিচয় হল সায়নদীপ, নিবেদিতা আর প্রসেঞ্জিতের সঙ্গে। আমরা স্টিল ধরলাম আর ঘণ্টা আড়াই পর পৌঁছে গেলাম ঝাড়গ্রাম স্টেশানে।

IMG_3647IMG_3658

IMG_3639.jpgঝাড়গ্রাম ট্যুরিজ্‌মের প্রতিনিধি হয়ে সুমন এসেছিল স্টেশানে আমাদের রিসিভ করতে। একটা সুমো দাঁড়িয়েছিল আমাদের জন্য, তাতে সওয়ার হয়ে আমরা অল্প সময়ে চলে আসলাম কৌশল্যা হেরিটেজে, এই দুই দিন আমরা এখানেই থাকব।

IMG_3649IMG_3634IMG_3683

সরকারী ট্যুরিস্ট লজের থেকে ৫-৭ কিলোমিটার দূরে হাইওয়ের উপর সুন্দর থাকার বন্দোবস্ত। আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে অতিকায় লুচি-তরকারি আর রসগোল্লা সহযোগে জলযোগ সম্পন্ন করে আমরা চলে আসলাম রবীন্দ্র মুক্তমঞ্চে। সবুজের ঘেরাটোপে উন্মুক্ত এই মঞ্চেই শুরু হল এই বছরের ঝাড়গ্রাম বসন্ত উৎসব।

IMG_3613IMG_3615IMG_3616

রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে শুরু করে একে একে মঞ্চস্থ হল রণ-পা নাচ, রাইবেঁশে নাচ, বিহু এবং মারাঠী লাবণী নাচ। এরই মাঝে চলছে মিষ্টিমুখ, ছবি তোলা এবং আবির নিয়ে দোল খেলা। সব শেষে ছিল ঝুমুর গান যদিও তা শুরু হওয়ার আগেই আমরা হোটেলমুখো হলাম।

IMG_3625IMG_3626IMG_3663

ফিরে এসে চানটান করে আমরা জড় হলাম তিনতলার ডাইনিং রুমে; ডাল, আলুভাজা, সজনে ডাঁটা-আলু-বেগুনের তরকারী, কাতলা মাছের ঝাল আর চাটনি সহযোগে যখন আমরা আমাদের দুপুরের খাওয়া শেষ করলাম বুঝতে পারলাম এখানকার জল-হাওয়ার গুণ, কয়েক ঘণ্টাতেই আমাদের খিদে বেড়ে গেছে কয়েকগুন।

IMG_3667IMG_3676IMG_3677

তখনই জানতে পড়লাম যে এই সব সবজিই পাশের বাগান থেকে তোলা, অরগ্যানিক ফারমিং ধাঁচের বাবস্থা। এরপর আমরা আশ্রয় নিলাম যে যার রুমে, তবে ঠিক হল কড়া রোদটা একটু পড়লেই আমরা বেড়িয়ে পড়ব আশপাশটা ঘুরে দেখতে।

IMG_3685IMG_3691IMG_3693IMG_3696

যেমন কথা তেমন কাজ, ঠিক সময় বেড়িয়ে পড়লাম আমরা, গন্তব্য পাশেরই এক গোলাপ-বাগান। হাইওয়ের উপর দিয়ে একটু এগিয়ে আমরা ঢুকে পরলার এক গ্রাম্য পথে। আমবাগান, কাজুর বাগান, বাঁশঝাড়, পরিত্যক্ত কারখানা, পোড়া অফিসঘর, পোড়ো-বাড়ি আর কিছু মাটির একতলা-দোতলা বসতবাড়ি পেড়িয়ে আমরা যখন আমাদের গন্তব্যে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।

IMG_3699IMG_3702IMG_3705IMG_3707

একটা ভারি মিষ্টি সুবাস তখন থেকে আমাদের পিছু নিয়েছে, অবশেষে বুঝলাম সেটা কাজু ফুলের গন্ধ। এরমাঝে অসংখ্য ছবি তুলেছি আমরা, এবার ফিরে যেতে হবে তবে আমাদের ঘোরার এবং জানবার আগ্রহে একটুও ভাঁটা পড়েনি। স্থানীয় কিছু মানুষ আমাদের ভয়  দেখাতে চেষ্টা করেছিল বা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল এই বলে যে এখানে জংলী হাতি দেখা গেছে দিন দুই আগে যদিও তাতে আমাদের দমাতে পারেনি।

IMG_3712IMG_3717

ফেরার পথে আমরা উঁকি দিলাম পথের পাশের এক গৃহস্থের  উঠনে। নাতিকে পাশে নিয়ে সেবাড়ির মহিলা আমাদের বললেন যে সত্যি করে জংলী হাতিরা দল বেঁধে  এখানে  চলে আসে, বিশেষ করে যখন ঝারাই বাছাই করে ধান তোলা হয় গোলায়ে। ওনার বাড়ির উঠনে  একটা  ছোট জলাধার বানানো আছে যার খোঁজ সেই হাতিরা জানে এবং জল খেতে প্রতি বছর এখানে আসেও। তিনি এও বললেন যে এযাবৎ মাত্র একবারই হাতিরা ধানের লোভে পড়ে গোলা ভেঙ্গে দিয়েছিল এনাদের তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে মানুষরাই জঙ্গল ধ্বংস করে হাতিদের বিচরণ ভূমির দখল নিচ্ছে, উল্টোটা একেবারেই নয়।

IMG_3721IMG_3724

আমরা ফিরে এসেছি আমাদের হোটেলে, সোজা উঠে এসেছি ডাইনিং রুমের পাশের খোলা ছাদে। আজ পূর্ণিমা, আকাশ রাঙিয়ে চাঁদ উঠেছে, আমরা পটাপট তার ছবি তুলছি আর অপেক্ষা করছি গরম গরম তেলেভাজা-মুড়ি আর চায়ের। আমিতো কার্যত ছাদে বাবু হয়ে বসে পরেছি যাতে চাঁদের ছবি তুলতে গিয়ে হাত না কাঁপে। এরপর উদয়নদা আমার ক্যামেরাটা চেয়ে নিলেন আরও কিছু ছবি তোলার জন্য, এতদুর ভালভাবে মনে আছে কিন্তু তারপর কি হল সঠিক জানা নেই, হটাৎ করে সব অন্ধকার হয়ে গেল আর আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম এই সুন্দর পরিবেশ থেকে…

IMG_3730IMG_3731IMG_3762IMG_3763IMG_3778

Advertisements